বাংলাদেশে ইসলামী আইন ও সামাজিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে জুয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ২০২৩ সালের ফতোয়া বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে গত পাঁচ বছরে জুয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া ধর্মীয় বক্তব্যের সংখ্যা ৭,৫০০টিরও বেশি, যার ৮৫%ই মসজিদভিত্তিক ওয়াজ মাহফিলে প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে ইসলামকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, ফলে ধর্মীয় নীতিমালা সামাজিক আচরণবিধি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসলামী স্কলারদের মতে, জুয়া (মাইসির) একটি গুরুতর পাপ যা ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পারিবারিক বন্ধন এবং আধ্যাত্মিক শান্তি ধ্বংস করে। কোরআনের সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৯০) এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসীগণ, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ, সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” বাংলাদেশের প্রায় ৯১% মুসলিম জনগণের জন্য এই আয়াতটি জুয়া বিরোধী ধর্মীয় বক্তব্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে জুয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বক্তব্যের প্রভাব পরিমাপ করতে গিয়ে দেখা যায়, ২০২২ সালে Religious Awareness Survey-এর তথ্য অনুসারে, দেশের ৭৪% প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ধর্মীয় নেতাদের জুয়া বিরোধী বক্তব্যকে ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাবশালী হিসেবে মানেন। বিশেষ করে রমজান মাসে এই ধরণের বক্তব্যের প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন টেলিভিশনে প্রচারিত বিশেষ অনুষ্ঠান এবং মসজিদের খুতবায় জুয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়।
| বছর | জুয়া বিরোধী ধর্মীয় বক্তব্য (টি) | মসজিদভিত্তিক (%) | মিডিয়া কভারেজ (%) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ১,২৫০ | ৭৮% | ২২% |
| ২০২১ | ১,৫৮০ | ৮২% | ১৮% |
| ২০২২ | ১,৭২০ | ৭৯% | ২১% |
| ২০২৩ | ১,৯৫০ | ৮৫% | ১৫% |
ধর্মীয় বক্তাদের মতে, জুয়া শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না, বরং এটি সমাজে অশান্তি, হতাশা এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির主要原因। বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ২০২৩ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, জুয়া ও স্লট গেমের সাথে জড়িত ৬৮% মামলায় অভিযুক্তরা ঋণগ্রস্ত হয়ে চুরি, ছিনতাই বা প্রতারণার দিকে ঝুঁকেছে। ঢাকার একজন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-ফারুক তার এক বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, “জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কখনই বরকতপূর্ণ হয় না, বরং তা পরিবারে কলহ ও অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে।”
বাংলাদেশের ইসলামী চিন্তাবিদগণ জুয়াকে ‘সমাজবিনাশী অভিশাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাদের মতে, জুয়া খেলার মাধ্যমে মানুষ অলস হয়ে পড়ে, পরিশ্রমের মূল্য ভুলে যায় এবং সহজ লাভের আশায় আসক্তিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে জুয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় 캠্পেইনের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে দেশব্যাপী ৫৬০টি মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়, যাতে প্রায় ২,৫০,০০০ তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ জুয়া সংক্রান্ত কার্যক্রম গোপনে চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর তথ্য মতে, ২০২৩ সালে জুয়া সংশ্লিষ্ট ১,২০০টি ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনলাইন জুয়ার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন, যা ধর্মীয় নেতাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জুয়া বিরোধী ধর্মীয় বক্তব্যের সর্বোচ্চ প্রভাব লক্ষ্য করা যায় গ্রামীণ জনপদে, যেখানে ৮৮% মানুষ এই বক্তব্য মেনে চলার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এই হার কিছুটা কম (৬৯%)। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে জীবনের ব্যস্ততা এবং ডিজিটাল জুয়ার প্রভাবে ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে সচেতনতা হ্রাস এই পার্থক্যের的主要原因。
বাংলাদেশের সুফি সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে জুয়াকে আত্মার শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মতে, জুয়া মানুষের আত্মিক উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কে ফাটল ধরায়। সিলেট অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত পীর তার এক ওয়াজে উল্লেখ করেন, “জুয়া খেলার সময় মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের জুজু খেলতে থাকে, যা তাওহীদের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক।”
বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতারাও তাদের各自的 ধর্মগ্রন্থের বিধান অনুযায়ী জুয়াকে নিন্দা করেন। হিন্দু ধর্মগ্র্ঞে বেদ ও মনুস্মৃতিতে জুয়াকে ‘ক্লীবতা ও ধ্বংসের পথ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের তথ্য মতে, দেশের হিন্দু মন্দিরগুলোতে বছরে গড়ে ৩০০টি বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয় জুয়া আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জুয়া বিরোধী সচেতনতা তৈরিতে নানা ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালে তাদের পাঠ্যক্রমে ‘জুয়ার সামাজিক ও ধর্মীয় কুফল’ শীর্ষক একটি বিশেষ কোর্স চালু করেছে, যা দেশের ১,২০০টি মাদরাসায় পড়ানো হচ্ছে। এই কোর্সে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫০,০০০ ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতারা জুয়া প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাথে সমন্বয় করে কাজ করছেন। তারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে জুয়া সংক্রান্ত লেনদেন বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুয়া সংশ্লিষ্ট সন্দেহে ২,৮৫,০০০টি মোবাইল ওয়ালেট একাউন্ট ব্লক করা হয়েছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জুয়া নিষেধ হলেও বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে某些 প্রচলিত জুয়া-like খেলা继续 চালু রয়েছে। বিশেষ করে某些 উৎসব-পার্বণে这些传统 খেলা দেখা যায়, যা নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে一定的 মতপার্থক্য রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই ধরনের খেলাকে ‘সাংস্কৃতিক অভ্যাস’ না ‘জুয়া’ হিসেবে গণ্য হবে কিনা তা নিয়ে持续 আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে জুয়া বিরোধী ঐক্য একটি লক্ষণীয় বিষয়। ২০২৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারফেইথ কাউন্সিল অ্যাগেইনস্ট গ্যাম্বলিং’ সম্মেলনে দেশের প্রধান চার ধর্মের (ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) নেতারা যৌথভাবে জুয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই সম্মেলনে ৫০০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং জুয়া মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বক্তব্যের কার্যকারিতা বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, জুয়া আসক্ত পরিবারগুলোর মাসিক আয়ের গড় ২৮% জুয়ায় ব্যয় হয়, যা তাদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। ধর্মীয় নেতারা এই পরিসংখ্যানগুলো তাদের বক্তৃতায় ব্যবহার করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছেন।
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জুয়া বিরোধী ধর্মীয় বক্তব্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাদ্রাসায় পড়ুয়া ৯৫% শিক্ষার্থী জুয়াকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করেন, যেখানে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের under শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই হার ৭২%। এই তথ্য ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাবের গুরুত্ব তুলে ধরে।
